মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি

রিপোর্ট নারায়ণগঞ্জ ২৪ : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেমনের মেয়র ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের বিষয়ে বিষয়টি অবিহিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট একটি লিখিত স্বারকলিপি প্রদান করেছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

মঙ্গলবার (১৯মার্চ) সকাল ১১টায় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ, অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতি, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র, সংরক্তিত আসনের নারী ও পুরুষ কাউন্সিলর সহ গোটা জেলার ২১ শ্রেণীর কয়েক হাজারস্থানীয় নেতাকর্মী সহ জনপ্রতিনিধি, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগনের স্বাক্ষরিত একটি স্বারকলিপি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট পাঠানো হয় এই স্বারকলিপি।

এ সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া স্বারকলিপিটি গ্রহন করেন এবং যথাযথ নিয়মেই প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রেরন করা হবে বলে তিনি জানান।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান শেষে সাংবাদিকদেও সাথে ব্রিফিংকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল স্মারকলিপির বরাত দিয়ে জানান, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত (মরণোত্তর) প্রায়াত একেএম সামসুজ্জোহা ও ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহন এবং ৭৫’পরবর্তী সময়ের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাতে নারায়ণগঞ্জবাসী গর্বিত ও সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, নারায়ণগঞ্জে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলেই একটি জনবিচ্ছিন্ন একটি শ্রেনি এই পরিবারটিকে টার্গেট করে মাঠে নামে এবং বিভিন্ন আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান করা শুরু করেছেন। সংবিধানের বাহক সেজে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের সাথে আঁতাত করা ক্ষমতার জন্য লালায়িত কিছু বড় বড় ডক্টর সাহেবদের প্রেসক্রিপশনে ঘন ঘন রাজধানী থেকে তথাকিথত কিছু সুশীলরা নারায়ণগঞ্জে আসছেন। পরিতাপ হয়, ক্ষোভ হয় যখন দেখি যার আহবান ও সমর্থনে এসব সুশীলরা আসেন, তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াত আইভী।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম গত ৬ মার্চ মেয়র আইভী জনসম্মুখে বললেন, নারায়ণগঞ্জে আজ পর্যন্ত যত খুন হয়েছে সেসবই ওসমান পরিবারের দ্বারা হয়েছে। আমরা স্তম্ভিত হলাম। আমরা আরো অবাক হলাম যখন শুনলাম মেয়র আইভী বলছেন,“সাগর-রুনীর ব্যাপারে আমরা অনেক কিছুই জানি, অনেক কিছু জড়িত, তনু হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না, সেটাও জানি কারা জড়িত” শুধু তাই নয়, মেয়র আইভীর উপস্থিতিতে ভাড়া করে আনা সুশীল ও তার সাথে থাকা জনবিচ্ছিন্ন গুটি কয়েক লোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যেসকল মিথ্যাচার ও ঔদ্ধত্বপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে তাতে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী বিস্মিত, হতবাক ও ক্ষুব্ধ।

নারায়ণগঞ্জের সর্বমহলে একটিই প্রশ্ন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের নেত্রী ও দলীয় মেয়র হয়ে আইভীর এমন বক্তব্য ও সুশীলদের প্রতি তার এতটা নগ্ন সমর্থন কেন? যুদ্ধাপরাধী আলবদর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ সহচর, কেন্দীয় মজলিসে সুরার সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মঈনুদ্দিন গত বছরের ২০অক্টোবর ২০১৮ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর একটি জবানবন্দি দিয়েছিলেন।

সেখানে জামায়াত আমীর অবলিলায় স্বীকার করেছেন বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত মেয়র আইভীকে কিভাবে কি কৌশলে জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এর মূল কারণ,পারিবারিকভাবে জামায়াতে ইসলামের সাথে মেয়র আইভীর সৌহার্দ্য পূর্ণ সম্পর্ক। ঐ জবানবন্দিতে পরিস্কারভাবে জামাতের আমীর বলেছেন, প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আগে থেকেই আইভীর সঙ্গে বেগম জিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটা হয়। খালেদা জিয়ার সাথে সমঝোতা ছিল নির্বাচনের পর বিএনপিতে যোগ দিবেন আইভী।

আর এই শর্তেই বিএনপির প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে গভীর রাতে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম চেয়েছিল আইভী যেন আওয়ামীলীগেই থাকুক। নিজের জবানবন্দিতে জামাত আমীর বলেছেন, বিএনপি-জামাতের পক্ষে শামীম ওসমানকে ঠেকানো সম্ভব নয় তাই আইভীকে আওয়ামীলীগই করতে হবে। ওকে আওয়ামী লীগে রাখতে পারলেই ভালো। এতে বিএনপি-জামায়াত সবার জন্য সুবিধা আছে।

জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা মাঈনুদ্দিন বলেন,‘রিলেশনটা ওপেন হলে সমস্যা। আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে। আমরাও চাই না আইভী বিব্রত করতে। আমাদের যে কোনো কাজে অনুরোধ করলে ডাইরেক্ট, ইনডাইরেক্ট সে বসে সহজে করে দিছে। অনেক কাজ করে দিছে। ঐ জবানবন্দিতে আরো যে ভয়ঙ্কর তথ্য দেয়া হয়েছে তা হলো, যে সময় পুরো দেশ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে উত্তাল, সেসময় মেয়র আইভী যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের পরিবারকে অতি গোপনে জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছেন । জামাতের আমীরের দেয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, “মুজাহিদ সাহেবের ওয়াইফ আর আইভী ক্লাসমেট ছিল। মুজাহিদ সাহেব যখন জেলে, তখন ওনার ছেলেদের জন্মনিবন্ধনও এখানেই হয়েছে। অনেক ঘুরাঘুরি করে যখন পাচ্ছিল না, তখন মুজাহিদের ওয়াইফ আইভীকে বলার পরই আধঘণ্টার মধ্যে এই জন্মনিবন্ধন হয়ে গেল”।
উপরে উল্লেখিত এসব ঘটনা ও আইভীর বক্তব্য প্রমাণ করে দলে জামায়াতের এজেন্ট কে বা কারা। জামায়াতের আমীরের দেয়া সেই জবানবন্দির প্রতিটি কথাই মিলে যাচ্ছে তার কর্মকান্ডে। ফলে আমরা চরম ভাবে শঙ্কিত ও আশঙ্কা করছি যে, নারায়ণগঞ্জে আবারো অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ২০০১এর ১৬ই জুনের বোমা হামলার মত আবারো কোন পৈশাচিক ঘটনার পরিকল্পনা হচ্ছে কি?

তিনি আরো বলেন, সরকারকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে সাগর-রুনী ও তনু হত্যাকান্ড নিয়ে মেয়র আইভীর বক্তব্যে আমাদেরও জিজ্ঞাসা, আসলে তিনি সাগর-রুনী ও তনু হত্যাকান্ড নিয়ে এমন কি জানেন? পাশাপাশি ওসমান পরিবারকে খুনী পরিবার আখ্যা দেয়ার নেপথ্যে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত এবং সেই ক্ষমতার জন্য লালায়িত তথাকথিত ডক্টর সাহেবদের প্রেসকিপশন রয়েছে তা অনেকটাই স্পষ্ট। একই সাথে ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারকে আঘাত করে স্বাধীনতার চেতনায় আঘাত করা হচ্ছে, আপনার দলের ক্ষতি সাধন করা হচ্ছে।

স্বারকলিপি প্রদানকালে এ সময় উপস্থিত ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীরীগের সাধারন সম্পাদক আবু হাসনাত শহিদ বাদল, মহানগরের সাধারন সম্পাদক এড. খোকন সাহা, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেমনের প্যানেল মেয়র মতউর রহমান মতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী অধ্যাপক ড. শিরিন বেগম, নারায়ণগঞ্জ মহানগর মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ইসরাত জাহান খান স্মৃতি, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ন সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক চজল্লুর রহমান লিটন, জেলা ছাত্ররীগ সভাপতি আজিজুর রহমান, মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সাবেক ছাত্ররীগ সভাপতি সাফায়েত আলম সানি ও সাবেক সাধারন সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন সহ প্রমূখ।